শিখার আগেই শিখতে বাধা!

একটি দেশ কত উন্নত সেটা বুঝা যায় সে জাতি কত উন্নত! জাতি কিসে উন্নত? অল্প পরিসরে বললে শিক্ষা, জ্ঞান, গবেষণা, চিকিৎসা সেবা, প্রযুক্তি ইত্যাদি। আরও বিভিন্ন খাত রয়েছে সেগুলোও বিবেচ্য বিষয়, তবে উল্লিখিত খাতগুলো উপরের দিকের বিবেচ্য বিষয়। একটি সুন্দর ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ রাতারাতিই গড়ে উঠে না। সেজন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, কৌশল, নীতিমালা। তবে এসবের কিছুই এখানে আলোচ্য বিষয় নয়। এমন কিছু ব্যাপার আমাদের দেশে আছে যেগুলো আমরা সেই ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, শুনে আসছি এবং অনেকেই এরকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখিও হয়েছি, যা আমাদেরকে শিখার আগেই শিখতে বাধা দেয়। এখানে তেমন কিছু বিষয় নিয়েই লিখছি। আর এগুলো থেকে অচিরেই আমাদের বেড়িয়ে আসা উচিত বলে আমি মনে করি।

এক

বেশি জানা আমাদের দেশে একটি অন্যায় বা পাপ! কি, অবাক হচ্ছেন? হ্যাঁ, আমাদের দেশে এটাই বাস্তব সত্য। আরেকটু সামনে এগুলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে। ধরুন, আপনি ভার্সিটি ১ম বর্ষের ছাত্র/ছাত্রী। আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন এক বড় ভাইয়া বা আপুর সাথে কোন এক বিষয় নিয়ে কথা বলছেন। প্রসঙ্গক্রমে কোন এক সময় সেটা বিতর্কে রুপ নিল। যদি কোনভাবে ঐ বিষয়ে আপনি আপনার ভার্সিটির বড় ভাইয়া কিংবা আপুর চেয়ে বেশি তথ্য, যুক্তি দাঁড় করিয়ে ফেলেন আর উনি সেটার প্রত্যুত্তর দিতে ব্যর্থ হন, তাহলে উনি কি বলবেন? বলবেন যে, বা*** পাকনা পোলা/মাইয়া, বেশি বুঝে, বাত্তি (গ্রাম্য/আঞ্চলিক ভাষা), আরও কত কি! আসলে উনি যে ব্যাপারটা জানেন না বা আপনি এক্ষেত্রে তার চেয়ে বেশি জানেন, বেশি স্মার্ট সেটা কিন্তু উনি মানতে নারাজ। ভাবখানা এমন যেন, আপনি উনার চেয়ে ছোট মানে আপনি কম জানেন। এরকমটা প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। বুঝার সুবিধার্থে শুধুমাত্র এই উদাহরণ টানা হল। এই যেমন, আপনার আত্নীয়, বন্ধু – বান্ধব কিংবা পাড়াতো ভাই/বোনের কথাই ভাবুন। তারাও কিন্তু এরকম আচরণ করার সম্ভাবনাই বেশি। অথচ এর জন্য কিন্তু আপনাকে বাহবা, উৎসাহ দেওয়ার কথা! তাই নয় কি? ছোট হয়েও বেশি জানা আমাদের দেশে বা**** পাকনামো আর উন্নত দেশে ‘স্মার্টনেস’! আমাদের দেশে এটা দেখে নেগেটিভলি অথচ উন্নত দেশে দেখে পজিটিভলি!

দুই

বেশি বেশি প্রশ্ন করা! এটা যেন আরও বড় অন্যায়, রীতিমত মহাপাপ! হ্যাঁ, ঠিক পড়েছেন। চলুন, একটি গল্পাকারে সেটি বুঝা যাক। ধরুন, আপনি ক্লাস সিক্সে পড়েন। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সম – সাময়িক বিষয়ে আপনার প্রবল আগ্রহ। ক্লাসে স্যার পড়াচ্ছেন বিজ্ঞান নিয়ে। আপনি একে একে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করছেন যেগুলো স্যার পড়াচ্ছেন। এক পর্যায়ে বিজ্ঞান বিষয়ক এমন প্রশ্ন করেছেন যা বইয়ে নেই, কিন্তু আপনি জানতে আগ্রহী। স্যার কি বলবেন, তোমার এতো কিছু এখনই জানার দরকার নেই, মহা পন্ডিত, এতো বেশি বুঝা ভালো না, এই ধরণের কথাবার্তা! কিন্তু এটাই কি হওয়া উচিত ছিল! স্যার, বিষয়টা জানলে সুন্দর করে বুঝিয়ে দিতে পারতেন, বা না জানা থাকলে বলতেই পারতেন এই বিষয়ে তার জানা নেই। তবে পরে জানতে পারলে আপনাকে জানাবেন। আপনাকে উৎসাহিত করতে পারতেন! অথচ আপনি তার এই আচরণ এর পরে আর কখনও কি প্রশ্ন করতে চাইবেন? সম্ভবত না। কারণ স্যার আপনাকে ক্লাসে সবার সামনে লজ্জা দেয়, ছোট করে। এটাও আমাদের দেশে খুবই স্বাভাবিক একটি চিত্র। ঠিক এই কৌতুহলী হওয়াটাকেই উন্নত দেশে বেশ ভালো চোখে দেখে, উৎসাহিত করে, অনুপ্রেরণা দেয়।

নোটঃ সব স্যারই এরকম এখানে সেটা বুঝানো যেমন হয় নি, তেমনি সব বড়রা যে এক সেটাও বুঝানো হয় নি। এরকম কিছু থাকায় শুধুমাত্র চিত্রটি তুলে ধরা হল।

আমাদের দেশে এই অতি সাধারণ দুটি চিত্র হরহামেশাই লক্ষ্য করা যায়। ফলে আমরা অনেক কিছুই তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকা সত্ত্বেও শিখতে পারি না শৈশব থেকে, রয়ে যায় অজানা। এসবই হচ্ছে আমাদের দেশে শিখার আগেই শিখতে বাধা!

 

 

 852 views

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email
Sharing is Caring:

Leave a Reply

Your email address will not be published.