কুরবানীঃ প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য

people bowing down inside canopy during day

প্রেক্ষাপটঃ ইসলাম হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা, যা একজন মুমিন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। আল্লাহর প্রতিটি বিধি বিধানের মধ্যে নিগুঢ় তাৎপর্য রয়েছে, যা আমরা অনেক সময় সঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারি না। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, “ইন্না ফি মালিকা লায়াতিল লিল আলামিন” অর্থাৎ “এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’’ আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নিগূঢ় তাৎপর্য বিধানসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো কুরবানীর বিধান। যা পৃথিবীর আদিকাল হতে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত চলে আসছে এবং ভবিষ্যতেও চলতে থাকবে। আল্লাহ বলেন, “আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানীর বিধান দিয়েছি।’’ কুরবানী আরবি শব্দ। এর অর্থ ত্যাগ, উৎসর্গ, বিসর্জন ও নৈকট্য লাভ। ইলমে ফিকাহের ভাষায় একে উযহিয়্যা বলা হয়।

অর্থাৎ মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট দিনে, পশু যবেহ করাকে উযহিয়্যা বা কুরবানী বলে। পবিত্র জিলহাজ্জ মাসের দশ তারিখে ঈদুল আযহার দু’রাকাত ওয়াজিব নামায শেষে সমগ্র বিশ্বব্যাপী মুসলমানরা আল্লাহর নির্দেশে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর স্মৃতিচারণে কুরবানী করে থাকে। কুরবানী করা ওয়াজিব

মানব ইতিহাসে সর্বপ্রথম কুরবানী হযরত আদম (আঃ) এর সময় থেকেই কুরবানী শুরু হয়েছিল। তাঁর পুত্র হাবিল কাবিল এর মাধ্যমেই পৃথিবীর প্রথম কুরবানী প্রথা শুরু হয়েছিল। তখনকার শরীয়াহ অনুযায়ী হযরত আদম (আঃ) এর প্রতি আদেশ হয়েছিল হাবিলের সঙ্গে কাবিলের বোনকে এবং কাবিলের সঙ্গে হাবিলের বোনের বিয়ে দিতে। কাবিলের বোন হাবিলের বোনের চেয়ে সুন্দরী ছিল। তাই সে হাবিলের বোন লাবিফাকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং তার বোন আকলিমাকে বিয়ে করতে চায়। এতে আদম (আঃ) তাদেরকে বলেন, “তোমরা উভয়ে আল্লাহর নামে কুরবানী কর। যার কুরবানী আল্লাহর নিকট কবুল হবে, আকলিমাকে সেই বিয়ে করবে।” হাবিল ছিল সৎ কর্মশীল ও মোত্তাক্বী, সে একটি মোটা তাজা দুম্বা কুরবানী করে পাহাড়ের উপর রেখে আসল। কাবিল ছিল অসৎ প্রকৃতির। সে কিছু শস্য, গম, সংগ্রহ করে সেখানে রেখে আসে। তখনকার বিধান মতে আসমান হতে আগুন এসে হাবিলের দুম্বা জ্বালিয়ে দেয় আর কাবিলের শস্য গম অক্ষত অবস্থায় পড়ে থাকে। এতে কাবিল রাগ হয়ে হাবিলকে হত্যা করে। (তথ্যসূত্র : মারেফুল কুরআান) 

হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত আছে তিনি বলেন, “সাহাবা কিরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সঃ), কুরবানী জিনিসটা কী?” রাসুলুল্লাহ (সঃ) ইরশাদ করলেন, এ হলো তোমাদের পিতা ইব্রাহিম (আঃ) এর সুন্নাত। সাহাবা কিরাম পুনরায় নিবেদন করলেন, এতে আমাদের কি কল্যাণ নিহিত আছে? তিনি বললেন, এর প্রত্যেকটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি রয়েছে। তোমরা মোটাতাজা পশু যবেহ কর। কেননা এগুলো পুলসিরাতে তোমাদের বাহন হবে। (ইবনে মাজাহ) 

আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বান্দার নিবেদিত ত্যাগই হচ্ছে কুরবানী। কুরবানী হচ্ছে স্রষ্টার প্রতি সৃষ্টির ত্যাগের এক অতুলনীয় নিদর্শন। যার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন হযরত ইব্রাহিম (আঃ)। যে ঘটনা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সুরা আস্সাফাতের ৯৯ থেকে ১১৩ নং আয়াতে উল্লেখ করেছেন। 

হযরত ইব্রহিম (আঃ) এর স্ত্রী সারা ছিলেন নিঃসন্তান। এক পর্যায়ে হযরত ইব্রহিম (আঃ) আল্লাহর নিকট একটি সন্তানের জন্য দোয়া করলেন। “রাব্বি হাব্বলি মিনাচ্ছলেহিন।’’-হে আল্লাহ আমকে সৎ পুত্র দান করুন। তাঁর এ দোয়া আল্লাহ কবুল করলেন এবং তাঁকে একটি পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল।

হযরত ইব্রাহিম (আঃ) যখন দেশ ত্যাগ করে মিশরে পৌঁছেন মিশরের তৎকালীন সম্রাট ফেরাউন তাঁর হাজেরা নামক কণ্যাকে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর স্ত্রীর সারার খেদমতের জন্য দান করেছিলেন। নবীর স্ত্রী সারা বিবি হাজেরাকে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর সাথে বিয়ে করিয়ে দিলেন। আর হযরত হাজেরার গর্ভেই জন্ম গ্রহণ করেছিলেন হযরত ইসমাইল (আঃ)। পরবর্তী পর্যায়ে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) আল্লাহর নির্দেশে শিশু পুত্র ইসমাইলসহ বিবি হাজেরাকে মক্কার মরুপ্রান্তরে জনশুন্য এলাকায় নির্বাসনে রেখে আসেন। আল্লাহর বিশেষ রহমতে এ বিজন প্রান্তরে মা হাজেরা তাঁর কলিজার টুকরা ইসমাইলকে লালন পালন করে বড় করে তোলেন। হযরত ইসমাইল (আঃ) এর বয়স যখন ১৩ বছর তখন হযরত ইব্রাহিম (আঃ) পরপর তিন রাত্র স্বপ্নের মাধ্যমে তাঁর প্রিয় বস্তুকে কুরবানীর করার নির্দেশ শুনতে পান। তাঁকে কিন্তু মহান আল্লাহ্‌ সরাসরি পুত্রকে কুরবানী করার নির্দেশ দেন নি। এখানেও রয়েছে মহান আল্লাহ্‌ এর পরিক্ষা। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) চিন্তায় পড়ে যান এবং অবশেষে তিনি উপলব্ধি করতে পারেন যে, এই পৃথিবীর মধ্যে তাঁর সর্বাধিক প্রিয় বস্তু হচ্ছে তাঁর স্নেহের হযরত ইসমাইল (আঃ)। 

হযরত ইব্রাহিম (আঃ) পুত্র ইসমাইল (আঃ) কে আল্লাহর এ নির্দেশের কথা জানালেন। অনুগতশীল নবী পুত্র ইসমাইল (আঃ) আল্লাহর এ নির্দেশ পালনে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন। পবিত্র কোরআনে সুরা সাফফাত এর ১০২ থেকে ১১১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ্‌ বলেন,

 “অতঃপর সে যখন পিতার সঙ্গে চলাফেরা করার মত বয়সে উপনিত হল,তখন ইব্রাহিম (আঃ) বললো, বৎস! আমি স্বপ্ন দেখেছি যে, তোমাকে যবেহ করছি। এখন তোমার অভিমত কি বল? সে বললো, “হে আমার পিতা, আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তাই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীলগণের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।” যখন তারা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করলো এবং ইব্রহিম পুত্রকে কাত করে শায়িত করলো, তখন আমি তাকে আহ্বান করে বললাম, হে ইব্রাহিম ! তুমি স্বপ্নাদেশ সত্যিই পালন করলে। এভাবেই আমি সৎকর্ম পরায়নদের পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চয়ই এ ছিলো এক স্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাকে মুক্ত করলাম এক কুরবানীর বিনিময়ে। আমি একে পরবর্তীদের জন্য স্মরণীয় করে রেখেছি। ইব্রাহিমের জন্য শান্তি বর্ষিত হইক। এভাবে আমি সৎকর্মপরায়ণদের পুরস্কৃত করে থাকি। সে ছিলো আমার মু’মিন বান্দাগণের অন্যতম। (সুরা সাফফাত ১০২-১১১ আয়াত)।

হযরত ইব্রাহিম ও হযরত ইসমাইল (আঃ) এর মহান প্রভূর সন্তুিষ্টর জন্য যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গিয়েছেন তা পৃথিবীর ইতিহাসে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমাদের চির শত্রু শয়তান বারবার তাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কঙ্কর নিক্ষেপ করে শয়তানকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ তিনি মনের ভ্রান্ত ছলনা, মানসিক দুর্বলতা এবং পুত্রের প্রতি স্নেহ-বাৎসল্যের উপর মহান আল্লাহর হুকুম ও তাঁর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। আর হযরত ইসমাইল (আঃ) তাঁর পিতার প্রতি আল্লাহর নির্দেশ পালনে নিজ জীবনের চেয়ে আল্লাহ ও তাঁর নবীর আনুগত্যকে বেশি প্রাধণ্য দিয়েছিলেন। এখানে পিতার প্রতি সন্তানের বিশ্বাসের এতটুকু চির ধরেনি। তারা উভয়ে আল্লাহর প্রতি সর্বোচ্চ ভালোবাসার নজির স্থাপন করেছিলেন। আল্লাহর কাছে নিজেকে উৎসর্গ করার জন্য হযরত ইসমাইল (আঃ) ছিলেন উদগ্রিব। তিনি পিতা ইব্রাহিম (আঃ)কে বলেছিলেন, ‘পিতা, আমাকে খুব শক্ত করে বেঁধে নিন যাতে আমি ছটফট করতে না পারি। আপনার পড়নের কাপড় সামলে নিন, যাতে আমার রক্তের ছিঁটা তাতে না পড়ে। এতে আমার সওয়াব হ্রাস পেতে পারে। এ ছাড়া এ রক্ত দেখলে আমার মা অধিক ব্যাকুল হবেন। আপানার ছুরিটাও ধার দিয়েনিন এবং তা আমার গলায় দ্রুত চালাবেন, যাতে আমার প্রাণ সহজে বের হয়ে যায়। কারণ, মৃত্যু বড় কঠিন ব্যাপার। আপনি আমার মায়ের কাছে পৌঁছে আমার সালাম বলবেন। যদি আমার জামা তাঁর কাছে নিয়ে যেতে চান, তবে নিয়ে যাবেন। হয়ত এতে তিনি কিছুটা সান্ত¦না পাবেন।’

 হযরত ইব্রাহিম (আঃ) পুত্রের স্নেহভরা এ সকল আকুতি শুনে ভারাক্রান্ত হয়ে জওয়াব দিলেন, ‘বৎস, আল্লাহর নির্দেশ পালনে তুমি আমার চমৎকার সহায়ক হয়েছ।’ অতঃপর তিনি পুত্রকে চুম্বন করলেন এবং অশ্রুপূর্ণ নেত্রে তাঁকে বেঁধে নিয়ে ইসমাইল (আঃ) এর গলে ছুরি চালালেন। কিন্তু মহামহিম দয়াল আল্লাহ সেখানে ইসমাইল (আ) এর পরিবর্তে, তিনি বেহেস্ত হতে দুম্ভা কুরবানী করালেন।

প্রকৃতপক্ষে হযরত ইব্রাহিম ও হযরত ইসমাইল (আঃ) কর্তৃক আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এ সর্বোচ্চ ত্যাগের প্রচেষ্টার নামই হচ্ছে কুরবানী। যে প্রসঙ্গে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, লাইয়াঁ-নালল্লাহা লুহুমুহা ওয়ালঅ দিমাউহা অলাকিনইয়ানা লুহুত্তাক্বওয়া মিনকুম” অর্থাৎ এগুলোর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, কিন্তু পৌঁছে তাঁর কাছে তোমাদের মনের তাকওয়া।’ 

প্রকৃতপক্ষে এখানেই কুরবানীর মহত্ব ও তাৎপর্য। মানুষ অর্থ ব্যয় করে কুরবানী করে আবার সেই কুরবানীর গোশত মানুষেই খায়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কোন বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে কুরবানী করেন না। তিনি মানুষের অন্তরের একনিষ্ঠতা আবেগ আর শ্রদ্ধা ভক্তির ভিত্তিতে বিচার করে থাকেন। এ প্রসঙ্গে হাদিস শরীফে হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের চেহারা -সুরত ও ধন ঐশ্বর্য দেখে বিচার করেন না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমল দেখে বিচার করেন। (মুুসলিম )

 সুতরাং শুধু পশু নয়; অন্তরের কুরবানীই হচ্ছে বড় কুরবানী।

তাৎপর্যঃ কুরবানীর সামাজিক তাৎপর্য অনবদ্য। কুরবানীর মাধ্যমে মানুষের পারস্পারিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পায় ও সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় হয়। শরীকানা কুরবানী সমআর্থিক সম্পন্ন পরিবারগুলোকে এক ব্যাস্থাপনায় এনে পারস্পরিক জানা শোনার পরিবেশ করে দেয়। যা থেকে একের প্রতি অন্যের হৃদ্যতা বৃদ্ধি করে।

কুরবানীর গোশত বণ্টনের নিয়মঃ কুরবানির গোশত বণ্টনের ক্ষেত্রেও রয়েছে অসাধারণ বিধি। কমবেশি সবারই জানা আছে, পশু কুরবানি করার পর মোট মাংসের তিনটি ভাগ করে এক ভাগ গরিব-দুঃখীকে, এক ভাগ আত্মীয়স্বজনকে এবং এক ভাগ নিজে খাওয়ার জন্য রাখতে হয়। এতে সমাজের দুস্থ, ইয়াতিম, অসহায় মানুষেরা ঈদ এর আনন্দ ভাগাভাগির পাশাপাশি আমিষের স্বাদ গ্রহণ করে তৃপ্তি পেয়ে থাকে।

অর্থাৎ গরু কত বেশি দামী না কম দামী সেটা আল্লাহ্‌ এর কাছে মুখ্য বিষয় নয়, মুখ্য বিষয় হচ্ছে বান্দার তাকওয়া, উৎসর্গ, ত্যাগ। আল্লাহ্‌ এর কাছে টাকা বা গোশত পৌঁছুবে না, পৌঁছুবে বান্দার তাকওয়া।

অতএব পরিশেষে বলা যায় যে, পশুর গলায় ছুরি চালানোর মাধ্যমে মাধ্যমে একমাত্র আল্লাহ্‌ এর সন্তুষ্টি অর্জনের নামই হলো কুরবানী। আল্লাহ আমাদেরকে কুরবানীর প্রকৃত মহাত্ম ও তাৎপর্য বুঝার ও আমল করার তাওফিক দান করুক। আমীন। 

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email
Sharing is Caring:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *