যেসব দক্ষতা আপনাকে ক্যারিয়ার গড়তে এগিয়ে রাখতে পারে!

‘ক্যারিয়ার’ চার অক্ষরের একটি ছোট্ট শব্দ। কিন্তু এর ব্যপকতা, বিশালতা ও গুরুত্ব অনেক। আজকাল এই যে এতো প্রতিযোগিতা, কিভাবে খুব ভালো স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া যায় সেটা নিয়ে শুধু অভিভাবকই নয়, আত্নীয়, শিক্ষার্থীরা যথেষ্ট সচেতন। কারণ ধারণা করা হয়, ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়তে পারলে ক্যারিয়ার গড়তে সহজ হয়। যদিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কখনোই কোন ভূমিকা রাখতে পারে না যতক্ষণ না আপনার নিজ ক্ষেত্রে যথেষ্ট দক্ষতা, সঠিক জ্ঞান না থাকে। যেমন ধরুন, আপনি কম্পিউটার বিজ্ঞানের ছাত্র। গ্রেজুয়েশন করেছেন সুনামধন্য কোন বিদ্যাপীঠ থেকে। কিন্তু কম্পিউটার বিজ্ঞানের কোন ক্ষেত্রেই আপনার পরিষ্কার ব্যাসিক/প্রাথমিক জ্ঞান নেই। তাহলে আপনি যত সুনামধন্য বিদ্যাপীঠেই পড়েন না কেন, হয়তো আপনি আপনার বিষয় সম্পর্কিত ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে কোন চাকুরি পেয়ে যেতে পারেন, কিন্তু সেটা বেশিদিন থাকবে না, আপনি যতই বেশি জিপিএ/সিজিপিএ ধারী হোন না কেন! তাই সবার আগে যা থাকা দরকার সেটা হচ্ছে আপনার বিষয়ে পর্যাপ্ত দক্ষতা; তারপরে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়, সিজিপিএ এসব ভূমিকা রাখবে। তবে তার মানে এই নয়, ভালো বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা সিজিপিএ’র কোন গুরুত্ব বা প্রয়োজন নেই। তবে আজকাল এই আধুনিক প্রযুক্তির যুগে শুধুমাত্র একাডেমিক দক্ষতা দিয়েই সফলতার চরম শিখরে যাওয়া যায় না। ভালো একাডেমিক পারফর্মেন্সের পাশাপাশি আপনাকে আরও বেশকিছু স্কিল/দক্ষতা রপ্ত করতে হবে। দক্ষতাগুলো রপ্ত করতে পারলেই আপনি অন্যদের চেয়ে ক্যারিয়ার জগতে নিজেকে অনেক এগিয়ে রাখতে পারবেন। আমার এই লেখায় তেমন কিছু নন-একাডেমিক স্কিল/দক্ষতা নিয়েই লিখার চেষ্টা করবো। তাহলে চলুন একে একে দেখে নেই কি কি দক্ষতা আমাকে, আপনাকে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রাখতে পারে! 

Do Something Great neon sign

Photo by Clark Tibbs/Unsplash

১। যোগাযোগ (Communication)

চাকুরি, ব্যবসা, পড়াশোনা কিংবা গবেষণা প্রতিটি ক্ষেত্রেই যোগাযোগ দক্ষতা একটি বড় ভূমিকা পালন করে।

কর্মক্ষেত্রে লিখিত এবং মৌখিক যোগাযোগের দক্ষতা উভয়ই সর্বাধিক গুরুত্ব পায় কারণ নিয়োগকর্তারা দেখে, মানুষ আপনাকে কিভাবে উপলব্ধি করে, আপনাকে এবং আপনার কথাগুলোকে মানুষ কিভাবে নিচ্ছে। এগুলো সহকর্মীদের সাথে আপনার সম্পর্ক স্থাপনের সম্ভাবনাগুলোকেও উন্নত করে। যোগাযোগ দক্ষতাগুলো আপনার কর্মক্ষমতা বাড়ায় কারণ এগুলো আপনাকে আপনার বসের/সিনিয়রের কাছ থেকে পরিষ্কার প্রত্যাশা বের করতে সহায়তা করে যাতে আপনি দুর্দান্ত কাজ উপহার দিতে পারেন।

কোনও প্রকল্পের বিষয়ে কে, কী, কখন, কোথায়, কেন, এবং কিভাবে ইত্যাদি বিষয়গুলো যদি আপনি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারেন তবে আপনি হবেন ঐ প্রতিষ্ঠানের জনপ্রিয় মুখ তথা হট টিকেট।

এ ব্যাপারে রবিনসন বলেছেন,

“যে কর্মীরা তাদের সমবয়সীদের সাথে কীভাবে যোগাযোগ করতে হয় তা জানে তারা বেশি কার্যক্ষম হয়।”

কিভাবে এটি উন্নত করতে পারেনঃ ভালো উপস্থাপক, একাডেমিশিয়ান, গবেষকদের বিভিন্ন উপস্থাপনা, লেখা, ইত্যাদি নিয়মিত পড়া। কিভাবে একজন অপরিচিত মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে হয় সেগুলো রপ্ত করা, যেমন কিভাবে ফরমাল ও ইনফরমাল ইমেইল লিখতে হয়, কিভাবে সম্বোধন করে লিখাটি শুরু করতে হয় এবং কিভাবে শেষ করতে হয় যাতে যাকে পাঠাচ্ছেন তার দৃষ্টি আকর্ষন করতে পারেন ইত্যাদি। ফরমাল ও ইনফরমাল ইমেইল  লিখার কিছু ভাষা, কৌশল ও পদ্ধতি রয়েছে। সেগুলো জানতে হবে। কিভাবে কারও সাথে সরাসরি সাক্ষাতে কথা বলতে হয়, নিজেকে উপস্থাপন করতে এগুলো শেখা।

২। টীমওয়ার্ক বা দলগত কাজ (Team-Work)

কথায় আছে “দশের লাঠি, একের বোঝা”। কোন প্রতিষ্ঠানের একটি বড় প্রকল্প শুধুমাত্র একজন দ্বারা সম্পাদন করা যতটা না সহজ, কয়েকজন মিলে করা তার চেয়ে অধিক সহজ।

একজন ব্যক্তি তার নিজের দ্বারা সমস্ত কিছু করার উপর একটি কোম্পানির সাফল্য খুব কমই নির্ভর করে। সফলতা হল বহু লোক একটি সাধারণ লক্ষ্যে বা প্রকল্পে কাজ করার ফলাফল। কর্মচারীরা/সহকর্মীরা তাদের বৈচিত্র্য প্রতিভা একে অপরের সাথে ভাগাভাগির মাধ্যমে খুব সহজেই তাদের কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করে লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে, যা কারও একার পক্ষে বেশ কঠিন।

নিয়োগকর্তারা একটি বন্ধুত্বপূর্ণ অফিস সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সহায়তা করতে টিম-মেটদের দিকে নজর রাখেন যা কর্মীদের ধরে রাখতে সহায়তা করে এবং ফলস্বরূপ শীর্ষ প্রতিভা আকৃষ্ট করে। তদুপরি, আপনার সহকর্মীদের সাথে ভালভাবে সহযোগিতা করতে সক্ষম হওয়া আপনার কাজের মানকে শক্তিশালী করে।

কিভাবে এই দক্ষতা বাড়াতে পারেনঃ কোন একটি প্রকল্পের টীমের সহকর্মীদের কাজের খোঁজ খবর রাখা, কিভাবে করছেন, কতটুকু হল, কোন সমস্যা হচ্ছে কি না ইত্যাদি। অর্থাৎ প্রয়োজনে তার কাজে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া, এভাবে শুরু করতে পারেন – “হেই এক্স, আমি তোমার/আপনার কাজ সম্পর্কে জানি; আমি কি তোমাকে/আপনাকে কোনভাবে সাহায্য করতে পারি?” 

৩। পরিস্থিতির সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়া (Adaptability)

সব সময় সবকিছু পরিকল্পনা মত হয় না। তাই, ঐ মুহূর্তে নিজেকে হতাশায় নিমজ্জিত না করে, আপনাকে ঐ সমস্যা সমাধানের বিকল্প উপায় বের করতে সক্ষম হতে হবে।

“সফল নেতারা হলেন তারা, যারা সমস্যা দেখা দিলে কিভাবে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে সামনে অগ্রসর হতে হবে জানেন,” বলেছেন রবিনসন।

৪। সমস্যা সমাধান (Problem Solving)

যে কোন সমস্যা কিভাবে সহজে সমাধান করা যায় সে দক্ষতা রপ্ত করা অন্যতম একটি দক্ষতা। বর্তমানে যে কোন ক্ষেত্রেই এই দক্ষতা অত্যাবশ্যকীয়।

কিছু ভুল হয়ে গেলে আপনি অভিযোগ করতে পারেন বা পদক্ষেপ নিতে পারেন। কোন সমস্যা নিয়ে কীভাবে চিন্তা করবেন তা জেনে রাখার গুণ আপনাকে নিয়োগকর্তার পক্ষে অনিবার্য করে তুলতে পারে।

নিয়োগকর্তারা সমস্যা সমাধানকারীদের উপর বিশ্বাস রাখতে পারেন, সেরা সমস্যা মোকাবেলা ও সমাধানকারীরা অনেক বড় বড় চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে সদা প্রস্তুত থাকে। সমস্যা নয়, বরং সমাধান নিয়ে আপনার বসের কাছে যান। তাকে বলেন যে, সমস্যাটি আপনি কিভাবে সমাধান করার পরিকল্পনা করছেন।

৫। গভীর চিন্তা/পর্যবেক্ষণ (Critical Thinking/Observation)

তত্ব ও তথ্য যথেষ্ট নয় যদি না আপনি জানেন কিভাবে এটি ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ করতে হয়। কোন সমস্যা দেখা দিয়েছে? কিভাবে আপনাকে সমাধান খোঁজা উচিত? গভীরভাবে চিন্তাশীল বা পর্যবেক্ষক হওয়া আপনাকে অন্যদের চেয়ে ভালো কর্মী হতে সহায়তা করবে।

৬। নেতৃত্ব (Leadership)

আত্নবিশ্বাস ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য আপনাকে আপনার সহকর্মীদের কাছে বেশ প্রভাব ফেলতে পারে এবং ফলে, বর্তমান ও ভবিষ্যতে তারা আপনার সাথে আরও বেশি কাজ করতে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। অনেক সময় এমনও হতে পারে, কোন একটি প্রকল্পের কাজ আপনাকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে যেখানে আপনার নেতৃত্বে সেটি পরিচালনা হবে। তখন আপনাকে সেটা দেখাশোনা করতে হবে। ‘নেতৃত্বের দক্ষতা’ আপনাকে প্রতিষ্ঠান ও নিয়োগকারীদের কাছে বেশ গ্রহণযোগ্য করে তুলবে এবং নতুন প্রকল্প আপনাকে দিয়ে করানোর সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। বেতনসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধাও বৃদ্ধি পাবে খুব দ্রুতই। তাই, ‘নেতৃত্বের দক্ষতা’ থাকা অত্যন্ত জরুরী। 

৭। উপস্থাপন (Presentation)

একজন দক্ষ কর্মী হিসেবে আপনার উপস্থাপন খুব সুন্দর, প্রাঞ্জল ও আকর্ষণীয় হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এতে আপনার প্রকল্প সম্পর্কে ধারণা, পরিকল্পনা সহজেই আপনার সহকর্মীদের নিকট বোধগম্য হবে। আপনার নিয়োগকারী হবে পুরোপুরি সন্তুষ্ট। 

এছাড়া কম্পিউটার এর প্রাথমিক জ্ঞান (যেমনঃ মাইক্রোসফট ওয়ার্ড, এক্সেল, পাওয়ারপয়েন্ট, স্প্রীডশীট ইত্যাদি), ওয়েব ডিজাইন (HTML, CSS, JavaScript, Python, R) গ্রাফিক্স ডিজাইন, ইমেইল এর ব্যবহার সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা আপনাকে অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে রাখবে।  

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email
Sharing is Caring:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *